প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

উপহার দেওয়া-নেওয়া ইসলামি সমাজব্যবস্থার এক সুন্দর ও সুমধুর রীতি। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর উপহার দাও, এতে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৯৪)
তবে ইসলামে হালাল-হারাম ও ইনসাফের সুস্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে। যেকোনো উপহার দেওয়া বা নেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। কিছু ক্ষেত্রে উপহারের মোড়কে ঘুষ, সুদ বা অন্যায়ের লেনদেন হয়, যা মহানবী (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তির জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যক্তিগত উপহার গ্রহণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ। এটি মূলত ঘুষের নামান্তর।
বিচারকদের দেওয়া উপহার মূলত তাঁদের পদের কারণে দেওয়া হয়; তাই পদস্থ অবস্থায় এমন উপঢৌকন গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং তা রাষ্ট্রীয় সম্পদের আত্মসাতের অন্তর্ভুক্ত।
একবার মহানবী (সা.) ইবনে লুতবিয়া নামের এক সাহাবিকে জাকাত আদায়ের জন্য পাঠান। তিনি ফিরে এসে কিছু সম্পদ নিজের কাছে রেখে বলেন, ‘এগুলো আপনাদের, আর এগুলো আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে।’
এ কথা শুনে মহানবী (সা.) রেগে যান এবং বলেন, ‘সে তার বাবা-মায়ের ঘরে বসে থাকল না কেন? তখন সে দেখত, তাকে কেউ উপহার দেয় কি না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৯৭)
মোল্লা আলী কারি এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, বিচারকদের দেওয়া উপহার মূলত তাঁদের পদের কারণে দেওয়া হয়; তাই পদস্থ অবস্থায় এমন উপঢৌকন গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং তা রাষ্ট্রীয় সম্পদের আত্মসাতের (গুলুল) অন্তর্ভুক্ত। (মোল্লা আলী কারি, মিরকাতুল মাফাতিহ শরহু মিশকাতিল মাসাবিহ, ৬/২৩৪৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০২)
কারও চাকরি, বিপদমুক্তি বা কোনো বৈধ কাজের জন্য সুপারিশ করা একটি মহৎ কাজ। কিন্তু এই উপকারের বিনিময়ে কোনো উপহার গ্রহণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য কোনো সুপারিশ করল, এরপর সে তাকে উপহার দিল এবং সে তা গ্রহণ করল, তবে সে সুদের একটি বড় দরজায় উপস্থিত হলো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৪১)
অর্থাৎ, নিঃস্বার্থ উপকারের পর উপহার নিলে তা সুদের মতো পাপে পরিণত হয়।
যখন তোমাদের কেউ কাউকে ঋণ দেয়, এরপর ঋণগ্রহীতা যদি তাকে কিছু উপহার দেয় অথবা নিজের বাহনে চড়তে দেয়, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে।সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৩২
বিপদে মানুষকে ঋণ দেওয়া একটি উত্তম কাজ, তবে ঋণদাতার জন্য ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা বা উপহার গ্রহণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ, কারণ এটি সুদের পর্যায়ভুক্ত।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কাউকে ঋণ দেয়, এরপর ঋণগ্রহীতা যদি তাকে কিছু উপহার দেয় অথবা নিজের বাহনে চড়তে দেয়, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৩২)
তবে আগে থেকেই যদি তাদের মধ্যে স্বাভাবিক উপহার বিনিময়ের সম্পর্ক থাকে, তবে তা ভিন্ন কথা।
পিতা-মাতার জন্য সন্তানদের উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সমতা ও ইনসাফ বজায় রাখা আবশ্যক। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া এক সন্তানকে বেশি বা দামি উপহার দেওয়া এবং অন্যদের বঞ্চিত করা ইসলামি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সাহাবি নোমান ইবনে বশিরকে তাঁর পিতা একটি দাস উপহার দিলে মহানবী (সা.) তা অনুমোদন করেননি। তিনি পিতাকে নির্দেশ দেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৮৭)
সন্তানদের মধ্যে এই বৈষম্যমূলক উপহার দেওয়া নবীজি স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন, কারণ এটি ভাইবোনদের মধ্যে হিংসা ও মনকষাকষির জন্ম দেয়।
যখনই এই উপহারের মধ্যে কোনো জাগতিক স্বার্থ, পদবির অপব্যবহার, সুদ বা বৈষম্য ঢুকে পড়ে, তখন তা আর উপহার থাকে না; বরং তা পরিণত হয় সামাজিক ব্যাধিতে।
যেভাবে বিচারক বা দায়িত্বশীলদের উপহার নেওয়া নিষিদ্ধ, তেমনি নিজের অন্যায় স্বার্থ হাসিল বা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে তাঁদের উপহার দেওয়াও নিষিদ্ধ। এটি মোড়কবদ্ধ ঘুষ ছাড়া আর কিছুই নয়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপরই আল্লাহর অভিশাপ।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩৭)
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি লিখেছেন, শাসক বা বিচারকদের উপঢৌকন দেওয়ার প্রথা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবিচার ও বৈষম্য তৈরি করে; যে সমাজে এই প্রথা স্বাভাবিক রূপ নেয়, সেখানে মজলুমের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয় এবং সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। (দেহলভি, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ২/১৩৪, কাদিমি কুতুবখানা, করাচি, ১৯৮৬)
উপহার হলো সম্প্রীতি ও ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু যখনই এই উপহারের মধ্যে কোনো জাগতিক স্বার্থ, পদবির অপব্যবহার, সুদ বা বৈষম্য ঢুকে পড়ে, তখন তা আর উপহার থাকে না; বরং তা পরিণত হয় সামাজিক ব্যাধিতে।
মুমিন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, উপহার আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে নবীজির এই সুস্পষ্ট সীমারেখা মেনে চলা।


