প্রকাশ: ১ অক্টোবর, ২০২৬

সুদূর অতীত থেকে সমকালীন সমাজ পর্যন্ত নারীজাতি যে বঞ্চনা, অবমাননা ও শারীরিক-মানসিক নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছে, তা যেকোনো সচেতন হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করে।
এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে অনেক বিবেকবান মানুষের অন্তরে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে, স্বজাতির প্রতি এক গভীর সহমর্মিতা ও বিশেষ পক্ষাবলম্বন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে একজন ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসীর মনে এ ক্ষেত্রে এক সূক্ষ্ম আত্মজিজ্ঞাসা দেখা দিতে পারে: নারীর বঞ্চনার কারণে তাদের প্রতি অতিরিক্ত সমবেদনা অনুভব করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো অন্যায় পক্ষপাতিত্ব বা পাপের কারণ?
পুরুষবিদ্বেষ এড়িয়ে শুধু নারীর ন্যায্য অধিকার ও সুরক্ষায় ব্যথিত হওয়াকে ইসলামি নীতিশাস্ত্র কীভাবে মূল্যায়ন করে?
স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা বা তাদের দুর্দশায় ব্যথিত হওয়া মানুষের একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা; ইসলামে এটি নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ আসাবিো হলো যখন কেউ সত্য ও ইনসাফ বিসর্জন দিয়ে শুধু নিজের গোষ্ঠীর পক্ষ নিয়ে অন্যের ওপর অবিচার করে।ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)
ইসলামে যে পক্ষপাতিত্বকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘আসাবিয়া’। অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার তোয়াক্কা না করে অন্ধভাবে নিজের দল, বংশ বা লিঙ্গের অন্যায়কে সমর্থন করা।
কিন্তু নিপীড়িত বা দুর্বল শ্রেণির প্রতি সহজাত মায়া ও সমবেদনা পোষণ করা কখনোই আসাবিয়্যাহ বা অন্যায় পক্ষপাতিত্ব নয়।
সাহাবি ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রা.) একবার নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, কোনো ব্যক্তির নিজ জাতিকে ভালোবাসা কি আসাবিয়্যাহর অন্তর্ভুক্ত?’ মহানবী (সা.) উত্তর দিলেন, ‘না; বরং আসাবিয়্যাহ হলো অন্যায়ের ক্ষেত্রে নিজ সম্প্রদায়কে সহায়তা করা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১১৯)
এই পার্থক্যের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়া উল্লেখ করেছেন, স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা বা তাদের দুর্দশায় ব্যথিত হওয়া মানুষের একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা; ইসলামে এটি নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ আসাবিো হলো যখন কেউ সত্য ও ইনসাফ বিসর্জন দিয়ে শুধু নিজের গোষ্ঠীর পক্ষ নিয়ে অন্যের ওপর অবিচার করে। (ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া , ২৮/৫১৮-৫১৯, মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা, ১৯৯৫)
ইসলামের কেন্দ্রীয় চেতনা হলো ‘আদল’ (ন্যায়বিচার) প্রতিষ্ঠা এবং মজলুমের পাশে দাঁড়ানো। আল্লাহ–তাআলা নিরপেক্ষতার নামে মজলুমের কষ্টকে উপেক্ষা করার সুযোগ দেননি; বরং সমাজে যারা শোষণের শিকার, তাদের মুক্তিতে এগিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘আর তোমাদের কী হলো যে তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করছ না সেই অসহায়-মজলুম পুরুষ, নারী ও শিশুদের মুক্তির জন্য—যারা ফরিয়াদ করে বলছে: “হে আমাদের রব, এই অত্যাচারীদের জনপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করুন এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন অভিভাবক নির্ধারণ করে দিন, আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী পাঠান?”’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৭৫)
ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল এমন এক জাহেলি সমাজে, যেখানে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো এবং নারীকে ভাবা হতো ভোগের সামগ্রী।
ইমাম আল-কুরতুবি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আয়াতে পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, তারা প্রাকৃতিকভাবেই দুর্বল এবং আত্মরক্ষায় তুলনামূলকভাবে বেশি অক্ষম; তাই তাদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া এবং তাদের অধিকার রক্ষায় অগ্রণী হওয়া ইমানের অপরিহার্য দাবি। (আল-কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন , ৫/২৭৯, দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪)
ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল এমন এক জাহেলি সমাজে, যেখানে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো এবং নারীকে ভাবা হতো ভোগের সামগ্রী। মুহাম্মদ (সা.) এক ঐতিহাসিক সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা, সম্মান, সম্পত্তিতে অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার অকাট্য স্বীকৃতি দেন।
বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি পুরুষ সমাজকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো; কেননা তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)
সফরে উটচালকেরা দ্রুত উট হাঁকালে মহানবী (সা.) তাঁদের সতর্ক করে বলতেন, ‘সাবধানে চালাও, কাচের পাত্রদের (নারীদের) যেন কষ্ট না হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৪৯)
নবীজি নারীর কোমলতা, সংবেদনশীলতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতি লক্ষ রেখেই এই উপমা ব্যবহার করেছেন, যেন পুরুষেরা তাদের সঙ্গে আচরণে সর্বদা সতর্কতা ও কোমলতা বজায় রাখে। (আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শারহি সহিহিল বুখারি , ১০/৫৪৫, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হি.)
শুধু মনের ভেতর ক্ষোভ পুষে রাখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশ করে মানসিক শক্তি ক্ষয় করা কোনো সমাধান নয়। এই মানবিক অনুভূতিকে বাস্তবমুখী ও কল্যাণকর কর্মে রূপান্তর করাই মুমিনের পরিচয়:
মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের সহযোগী।সুরা তাওবা, আয়াত: ৭১
অধিকার সচেতনতা: যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা বা উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে বঞ্চনার শিকার নারীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আইনি ও সামাজিক সহায়তার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
পেশাগত দক্ষতা অর্জন: মনোবিজ্ঞান, ক্লিনিক্যাল কাউন্সেলিং কিংবা সমাজকর্ম বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে মানসিক ট্রমা ও বিপর্যয়ে পড়া নারীদের পেশাদার সহায়তা দেওয়া।
আশ্রয় ও পুনর্বাসনে ভূমিকা: সুবিধাবঞ্চিত কন্যাশিশুদের শিক্ষা এবং অসহায় নারীদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া।
ইসলামি মূল্যবোধের সঠিক প্রচার: ইসলামের পারিবারিক বিধিবিধান ও নারীর প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা, যাতে কুসংস্কার ও উগ্রতার অবসান ঘটে।
নারীর প্রতি গভীর সমবেদনা কোনো অন্যায় পক্ষপাতিত্ব নয়; বরং তা হলো ইনসাফকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তবে এই অনুভূতির পথ যেন কোনোভাবেই অন্ধ পুরুষবিদ্বেষ বা পারিবারিক কাঠামো ধ্বংসের রূপ না নেয়।
পুরুষ ও নারী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধুসুলভ সহযোগী।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৭১)


