Advertisement

উঠানে ঝুলছে লামিয়ার পোশাক, ঘরে মায়ের বিলাপ—‘আমার বুকটা খালি করে চলে গেলি’

প্রথম আলো

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

লামিয়া আক্তারছবি: সংগৃহীত
লামিয়া আক্তারছবি: সংগৃহীত

খালপাড়ে টিনশেডের কাঁচা ঘর। সামনে ছোট্ট উঠান। সেই উঠানে গাছের সঙ্গে বাঁধা একটি দড়িতে ঝুলছে কয়েকটি পোশাক। ঘর থেকে আসছে এক নারীর বিলাপ, ‘আমরা বুকটা খালি করে চলে গেলি। আমি কাকে নিয়ে থাকব।’

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া চার বছরের শিশু লামিয়া আক্তারের ঘরে গিয়ে আজ শুক্রবার সকালে এই চিত্র দেখা যায়। লামিয়ার বাড়ি উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাগরপাড়ে। ওই এলাকার বাসিন্দা ইমাম হোসেন ও সুমি আক্তার দম্পতির একমাত্র মেয়ে ছিল লামিয়া। গতকাল বৃহস্পতিবার হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

আজ সকালে এলাকাটিতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের উঠানে লামিয়ার কিছু কাপড় শুকাতে দেওয়া হয়েছে। ঘরের ভেতরে বিলাপ করা লামিয়ার মা সুমি আক্তারকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন কয়েকজন স্বজন। ঘরের বারান্দায় নির্বাক বসে রয়েছেন তার বাবা ইমাম হোসেন।

বিলাপ করতে করতে লামিয়ার মা সুমি আক্তার বলতে থাকেন, ‘আমার মেয়েটা কিছু খেতে চাইছিল না। তাই আদর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বমি করে দিয়েছে। আমার মেয়েটা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি এখন কাকে খাইয়ে দিব।’

মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই কেঁদে ওঠেন লামিয়ার বাবা ইমাম হোসেন। বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার আমার সঙ্গে মসজিদে যেত আমার মেয়ে। গত শুক্রবার নিইনি বলে কী রাগ! মেয়েটা খুব সুন্দর করে গজল গাইত। দুই মাস ধরে কেবল বলত, “আব্বু আমি আল্লাহর কাছে চলে যাব।” সত্যিই যে মেয়েটা চলে যাবে, ভাবতে পারিনি।’

আমার মেয়ে ঘুরতে ভালোবাসত। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকত। গায়ে একটু কাদা লাগলেই সেটি সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলত। আর সব সময় নতুন পোশাক পরতে চাইত। এখন আমি কার জন্য নতুন পোশাক কিনব।
—ইমাম হোসেন, লামিয়ার বাবা

ইমাম হোসেন জানান, তিনি বেশ কদিন জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি সুস্থ হওয়ার এক দিন পর তাঁর মেয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্রথম দিকে দু-এক দিন সর্দিকাশি ছিল। গত সোমবার জ্বর আসে। গত বুধবার সকাল থেকে কিছু খাচ্ছিল না। চিকিৎসকের পরামর্শে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করালে গতকাল ডেঙ্গু শনাক্ত হয় লামিয়ার। গতকাল সকাল থেকে পরপর দুবার কালো রঙের বমি হতে দেখে চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যেই লামিয়ার মৃত্যু হয়।

ইমাম হোসেন বলেন, ‘আমরা বিআইটিআইডি হাসপাতালের দিকে রওনা দিয়েছিলেন। ভাটিয়ারীতে পৌঁছানোর পরই মেয়ের খিঁচুনি শুরু হয়। একটু পর স্বাভাবিক হলেও হাসপাতালের সামনে গিয়ে আবার খিঁচুনি ওঠে। এ সময় তার মৃত্যু হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে ঘুরতে ভালোবাসত। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকত। গায়ে একটু কাদা লাগলেই সেটি সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলত। আর সব সময় নতুন পোশাক পরতে চাইত। এখন আমি কার জন্য নতুন পোশাক কিনব।’

লামিয়ার বাবা ইমাম হোসেন স্থানীয় একটি স্টিল রি-রোলিং মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। টিনশেডের কাঁচা ঘরটিতে ইমাম হোসেনের স্ত্রী ছাড়াও মা ও তিন ভাই থাকেন।

লামিয়াদের বাড়িতে এক সারিতে চারটি ঘর। বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়ির অন্তত নয়জন বাসিন্দা বর্তমানে জ্বরে আক্রান্ত। এর মধ্যে ইমাম হোসেনের দুই ভাই ও মা রয়েছেন। কারও তিন দিন, কারও অন্তত পাঁচ দিন ধরে জ্বর। এর মধ্যে বেশির ভাগই ডেঙ্গু পরীক্ষা করেননি। বাড়ির বাসিন্দা আম্বিয়া খাতুন বলেন, বাড়িতে একসঙ্গে এত মানুষের জ্বর আগে কোনো সময় হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি ঘরের সামনে বৃষ্টির পানি জমানোর জন্য বালতি, ড্রাম রয়েছে। উন্মুক্ত এসব বালতি-ড্রামের পানিতে মশার লার্ভায় ভর্তি। এক নারী জানান, কবুতরকে পানি দেওয়ার জন্য মজুত করে রেখেছেন। এ ধরনের জমানো পানি থেকে মশার বিস্তার ঘটতে পারে, তা তাঁর জানা নেই।

গত ১৫ দিনে সীতাকুণ্ডে তিন শিশুসহ পাঁচজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ফুলতলা গ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মো. মোজাহিদুল ইসলাম নামের চার বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। এর এক সপ্তাহ পর ১৫ সেপ্টেম্বর উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তুলাতলি গ্রামে মো. রাফসান (২৪) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়।

১৭ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ এলাকার সিরাজুম মুনিরা নামের পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু মারা যায়। গত মঙ্গলবার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের কাজলীপাড়া এলাকার কোরবান আলী রিফাত (১৭) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়।

Lading . . .