Advertisement

হরমুজে জাহাজে মিসাইল হামলা, বাংলাদেশি নাবিক যা বললেন

প্রথম আলো

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

‘এমভি কেপ দাও’ জাহাজের প্রধান প্রকৌশলী মো. আমান উল্লাহছবি: সংগৃহীত
‘এমভি কেপ দাও’ জাহাজের প্রধান প্রকৌশলী মো. আমান উল্লাহছবি: সংগৃহীত

‘সকালে কেবিনে না গিয়ে ইঞ্জিনের নিয়ন্ত্রণকক্ষের সোফায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। জাহাজটি তখন হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছিল। হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণে পুরো জাহাজ কেঁপে ওঠে। সোফা থেকে ছিটকে পড়ে যাই। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। কোনোমতে উঠে বাইরে আসি। চারদিকে অন্ধকার, ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধ। নাবিকদের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। একসময় মনে হয়েছিল, হয়তো আর বাঁচব না।’

ওমান উপকূলের অদূরে হরমুজ প্রণালিতে ‘এমভি কেপ দাও’ জাহাজে হামলার সেই মুহূর্তের কথা এভাবেই বলছিলেন জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী মো. আমান উল্লাহ। বর্তমানে ওমানের একটি হোটেলে আছেন তিনি। সেখান থেকে বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপ ইমোতে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন।

ভাবলাম, হয়তো আর যোগাযোগ করতে পারব না। তাই বড় ছেলে সাকিবকে অডিও বার্তা পাঠালাম। বললাম, আমাদের জাহাজে হামলা হয়েছে, আমাদের জন্য দোয়া করতে।
মো. আমান উল্লাহ, প্রধান প্রকৌশলী, এমভি কেপ দাও।

আমান উল্লাহ বলেন, প্রথম হামলার পর জাহাজের ইঞ্জিন ও আবাসিক অংশে ব্যাপক ক্ষতি হয়। পাইপ ফেটে যায়, ধোঁয়া ও গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন নাবিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ হামলায় তাঁদের এক সহকর্মী ভারতীয় নাবিক সুরজ যাদব নিহত হন।

ওমানের মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার জানিয়েছে, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী এমভি কেপ দাওতে হামলার পর ইঞ্জিনকক্ষে আগুন ধরে যায়। রয়্যাল নেভি অব ওমান ২৭ নাবিককে উদ্ধার করে। একজন ভারতীয় নাবিক নিহত হন।

‘ভাবলাম, শেষবারের মতো পরিবারকে জানাই’

হামলার পর আবার আঘাত আসতে পারে—এমন আশঙ্কা হচ্ছিল আমান উল্লাহর। তখনই মনে পড়ে চট্টগ্রাম নগরের এনায়েতবাজারে থাকা স্ত্রী ও তিন সন্তানের কথা। তিনি বলেন, ‘ভাবলাম, হয়তো আর যোগাযোগ করতে পারব না। তাই বড় ছেলে সাকিবকে অডিও বার্তা পাঠালাম। বললাম, আমাদের জাহাজে হামলা হয়েছে, আমাদের জন্য দোয়া করতে।’

সেই অডিওতে আমান উল্লাহ কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিলেন, ‘আব্বু আব্বু, আমাদের জাহাজে মিসাইল অ্যাটাক হইছে। দোয়া করো আব্বু। হয়তো আর কমিউনিকেশন করতে পারব না।’

কেবিনটি তখন ধ্বংসস্তূপ

বিস্ফোরণের প্রায় ১০ মিনিট পর নিজের কেবিনের দিকে যান আমান উল্লাহ। তিনি জানান, ধোঁয়ার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে তিনি ভেতরে ঢুকতে পারছিলেন না। সেখানে গিয়ে দেখেন, কেবিনের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।

আমান উল্লাহ বলেন, ‘সেদিন কেবিনে না গিয়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষে ছিলাম। পরে গিয়ে দেখি, যে কেবিনে থাকার কথা ছিল, সেটিই ধ্বংস হয়ে গেছে। তখনই মনে হলো, কেবিনে থাকলে হয়তো আর বেঁচে ফেরা হতো না।’

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, জাহাজটির আবাসিক অংশ ও ইঞ্জিনকক্ষের কাছাকাছি দুটি আঘাত লাগে। হামলার পরপর ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র—কেউ দায় স্বীকার করেনি। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস বা ওমানের কর্তৃপক্ষও এ হামলার দায় কার, তা জানাতে পারেনি।

জাহাজটির আবাসিক অংশ ও ইঞ্জিনকক্ষের কাছাকাছি দুটি আঘাত লাগে। হামলার পরপর ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র—কেউ দায় স্বীকার করেনি। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস বা ওমানের কর্তৃপক্ষও এই হামলার দায় কার তা জানাতে পারেনি।

শেষ কথা, শেষ চাদর

হামলার কিছুক্ষণ আগেই আমান উল্লাহর কাছে এসেছিলেন ভারতীয় নাবিক সুরজ যাদব। মো. আমান উল্লাহ বলেন, ‘সে এসে বলল, “চিফ, তুমি এখনো ডিউটি করছ?” তারপর সোফায় আমার জন্য চাদর বিছিয়ে দিল। ওর সঙ্গে ওটাই আমার শেষ কথা।’

আমান উল্লাহ বলেন, ‘যে সোফায় সুরজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছিল, সেখানেই বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। এর মধ্যেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সুরজ আর ফেরেনি। আমাকে খুব শ্রদ্ধা করত সে। ওর মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।’

৪৫ মিনিট পর উদ্ধার

আমান উল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার পরপরই জাহাজ থেকে এসওএস বার্তা পাঠানো হয়। এর প্রায় ৪৫ মিনিট পর ওমানের নৌবাহিনী এসে নাবিকদের উদ্ধার করে। জাহাজটি তখন ওমানের মুসান্দাম উপকূলের কাছে ছিল। সেখান থেকে উদ্ধার নাবিকদের তীরে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তাঁদের হোটেলে রাখা হয়েছে।

আমান উল্লাহ বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনা সাকার বন্দর থেকে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন চুনাপাথর নিয়ে জাহাজটির ভারতের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। গত বুধবার ভোরে যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর হরমুজ প্রণালির কাছে আমিরাতের মালিকানাধীন জাহাজটিতে হামলার ঘটনা ঘটে।

৩৫ বছরের পেশায় এমন অভিজ্ঞতা প্রথম

৩৫ বছরের নাবিকজীবনে এমন হামলার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম আমান উল্লাহর। তবে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও নিজের পেশা ছাড়তে চান না তিনি। আমান উল্লাহ বলেন, ‘এ সমস্যা পেশাগত নয়, প্রত্যেক পেশার অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থা থাকবেই। আমরা এ পেশার জন্যই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাই তো আমরা মেরিন প্রকৌশলী।’

অবশ্য হামলার সময় জাহাজে থাকারই কথা ছিল না আমান উল্লাহর। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ করে জাহাজ থেকে নেমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশি হিসেবে ভিসা না পাওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি।

হামলার পাঁচ দিন পর এখন ওমানের হোটেলে নিরাপদে রয়েছেন আমান উল্লাহ। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে দেশে ফিরবেন বলে জানান আমান উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘চুপচাপ বসে থাকলে সেদিনের দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এখনো মনে হয়, কানে বিস্ফোরণের শব্দ বাজছে।’

Lading . . .