Advertisement

হারিকেনের আলোয় রাত জেগে পড়া নজরুলের তিন বিসিএসে সাফল্য

প্রথম আলো

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নজরুল ইসলাম। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামেছবি: প্রথম আলো
নজরুল ইসলাম। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যার পর কুপি কিংবা হারিকেনের আলোই ছিল পড়ার ভরসা। সেই আলোয় রাত জেগে পড়তেন নজরুল ইসলাম। কখনো বাবার কৃষিকাজে হাত লাগাতেন, কখনো রাতে ওষুধের দোকানে কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগও ছিল না।

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের ভয়রাপাড়ার নজরুল ইসলাম (২৭) ৪৫তম ও ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডার এবং ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছেন। ৪৯তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা ৪৬তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার আগে হওয়ায় প্রথমে ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পান নজরুল। পরে ৪৬তম বিসিএসে নিজের পছন্দের প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে এখন চাকরিতে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি।

নিয়ামতপুর সিনিয়র আলিম মাদ্রাসা থেকে দাখিল (এসএসসি) ও আলিমে (এইচএসসি) জিপিএ-৫ পান নজরুল। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৩২০তম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ২০২তম হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন।

নজরুলের বাবা জালাল উদ্দিন কৃষক। চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নজরুল দ্বিতীয়। নজরুলের বড় ভাই নাজমুল ইসলাম স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। সেজো ভাই বরজু মিয়া রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। ছোট ভাই তৌফিক মিয়া দশম শ্রেণিতে এবং বোন জান্নাতুন আক্তার অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

ছেলের মনের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় আমার জীবনের সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে।
জালাল উদ্দিন, নজরুল ইসলামের বাবা

বাবা জালাল উদ্দিন কৃষিকাজের পাশাপাশি ঝালমুড়ি বিক্রি করেও সংসার চালিয়েছেন। সীমিত আয়ের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া কঠিন ছিল। বাবার কাজেও সহযোগিতা করতেন নজরুল। আলিম পড়ার সময়ও তাঁদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। কুপি ও হারিকেনের আলোয় রাত জেগে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে কিছুদিন রাতে স্থানীয় একটি ওষুধের দোকানে কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়াশোনার খরচ চালাতে প্রাইভেট পড়িয়েছেন।

মা–বাবার কষ্ট দূর করতে একদিন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন নজরুল। তিনি বলেন, ‘মা–বাবা ও শিক্ষকদের দোয়ায় এবং আল্লাহর রহমতে আমি আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছি। আমি যেন সততা আর কর্মনিষ্ঠা বজায় রেখে দেশের সেবা করতে পারি এবং সুনামের সঙ্গে চাকরিজীবন কাটাতে পারি—সকলের কাছে সেই দোয়া চাই।’

ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ছেলের মনের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় আমার জীবনের সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে।’

প্রায় এক দশক আগে, ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর প্রথম আলোয় নজরুলকে নিয়ে ‘দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায়, তবু পড়া নিয়ে শঙ্কা!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও অর্থের অভাবে তাঁর উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা ছিল। সেই শঙ্কা পেরিয়ে এবার নিজের কাঙ্ক্ষিত প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছেন তিনি।

Lading . . .