পণ্য উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে, উদ্বিগ্ন শিল্পোদ্যোক্তারা
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্লাস্টিকের পাইপ ও ফিটিংস, দরজা, আসবাব ইত্যাদি পণ্য উৎপাদন করে ন্যাশনাল পলিমার। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামাল পেট্রোকেমিক্যাল ও দেশে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় নিজেদের তৈরি পণ্যের দাম ৪-৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ন্যাশনাল পলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রিয়াদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পেট্রোকেমিক্যালের দাম ১৫-১৭ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাকের ভাড়া বেড়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর চালানোর খরচ বাড়ছে। সব মিলিয়ে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখন প্লাস্টিক পণ্যের বিক্রি ২০ শতাংশ কম। এ রকম অবস্থায় পণ্যের দাম বাড়লে বিক্রি আরও ৭-৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্লাস্টিক পণ্যসহ বিভিন্ন শিল্প খাতে ইতিমধ্যে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে শুরু করেছে। সেই ব্যয় সামলাতে পণ্যের দাম কতটুকু বাড়াতে হবে, সেই হিসাব-নিকাশ করছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তাতে খুব শিগগির প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, রড, সিমেন্ট, প্লাস্টিক পণ্য ইত্যাদির দাম বাড়তে পারে।
বিভিন্ন শিল্পের ১০ জন উদ্যোক্তা এমন ইঙ্গিত দিয়ে জানালেন, জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে খরচ বাড়বে। পণ্যের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবে বিক্রিও কমে যায়। আর বিক্রি কমলে উৎপাদন কমাতে হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্য বিক্রির ওপর কতটা প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তাঁরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়াটা যৌক্তিক। তবে কতটুকু মূল্য বাড়বে, সেটি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদারকি করা দরকার। আবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে স্থানীয় বাজারেও যথাযথভাবে দাম কমানোর পরিকল্পনা রাখতে হবে সরকারকে।—খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সিপিডি।
গত রোববার রাতে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। আর পেট্রলের নতুন দাম লিটারে ১৬০ টাকা ও অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের মূল্য লিটারে ১৫ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। গত জুনে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ে।
মোড়কজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অথবা পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে ব্যয় সামাল দেয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান। তবে এবার জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে ৫, ১০ টাকার মতো কম দামের ছোট আকারের মোড়কজাত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না—এমন ইঙ্গিত দিলেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যয় বাড়বে। আবার খুচরা দোকানদার ও ডিলারদের মার্জিনও বাড়াতে হবে। তাতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়বে। দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের বিক্রি কমে যাবে। ফলে ব্যবসায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
কম দামের মোড়কজাত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে নাকি পরিমাণ কমানো হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুজ্জামান কামাল বলেন, পরিমাণ কমাতে কমাতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন কমাতে গেলে হয়তো প্যাকেটে কিছু থাকবে না। তাই দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
দেশের আরেক শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী এসিআই গ্রুপ তাদের ভোগ্যপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য উৎপাদনে কত খরচ বাড়ছে সেটি পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের পণ্যের মধ্যে রয়েছে আটা, ময়দা, সুজি, লবণ, মসলা, কনফেকশনারি ইত্যাদি।
জানতে চাইলে এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ডসের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা (সিবিও) কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সবকিছুর দাম বাড়ে। আমরা দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই কেবল পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করি। যে হারে জ্বালানির দাম বেড়েছে, তাতে বড় রকমের দাম বাড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে রড, সিমেন্টসহ সব নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়বে। সে ক্ষেত্রে নির্মাণসামগ্রী বিক্রিতে মন্দাভাব আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন শিল্পকারখানার উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সুমন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ধারণা, রড উৎপাদনের ব৵য় টনপ্রতি ১,০০০-১,২০০ টাকা বাড়তে পারে।’
নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে তৈরি পোশাক পরিবহনে প্রতি কাভার্ড ভ্যানে গত সপ্তাহ পর্যন্ত খরচ লাগত ১৫ হাজার টাকা। তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সেই ব্যয় ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা হয়ে গেছে।
এমন তথ্য দিয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কাঁচামাল আমদানি ও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে খরচ বাড়বে। পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের সময়ে উৎপাদন চালানোর জন্য জেনারেটর তেল কিনতে বাড়তি অর্থ গুনতে হবে। তা ছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দামও বাড়বে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হবে। তাঁরা একপর্যায়ে মজুরি বাড়ানোর দাবি করতে পারেন। সব মিলিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য কঠিন পরিস্থিতি আসছে।
নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে তদারকির ওপর জোর দিলেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়াটা যৌক্তিক। তবে কতটুকু মূল্য বৃদ্ধি পাবে, সেটি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদারকি করা দরকার। আবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে স্থানীয় বাজারেও যথাযথভাবে দাম কমানোর পরিকল্পনা রাখতে হবে সরকারকে।


