Advertisement
  • হোম
  • রাজনীতি
  • ইনু নিজে হত্যা করেননি বা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেননি, ...

ইনু নিজে হত্যা করেননি বা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেননি, তবে দমন–পীড়নে নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন

প্রথম আলো

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রায় ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২–এ হাসানুল হক ইনু। ৩০ জুন ২০২৬ছবি: চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ফেসবুক লাইভ থেকে নেওয়া
রায় ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২–এ হাসানুল হক ইনু। ৩০ জুন ২০২৬ছবি: চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ফেসবুক লাইভ থেকে নেওয়া

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু নিজে কাউকে হত্যা করেছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব বা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেননি। তবে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি সচেতনভাবে সহিংস দমন–পীড়নমূলক অভিযানে রাজনৈতিক বৈধতা ও নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে ঘোষিত রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে এসব বিষয় উল্লেখ রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়টি ৫০০ পৃষ্ঠার।

হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৩০ জুন রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল–২। এ মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তিনটি অভিযোগেই তাঁকে ১০ বছর করে সাজা দেওয়া হয়। ঘোষিত রায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন, তিনটি অভিযোগে সাজা দেওয়া হয়েছে ১০ বছর করে, তাহলে ৩০ বছর হয়। কিন্তু এই সাজা যুগপৎ চলবে। তার মানে সাজা হবে ১০ বছর।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাজা নির্ধারণ কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয় বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে সাজা প্রদানের প্রধান উদ্দেশ্য কেবল প্রতিশোধ গ্রহণ নয়; বরং আন্তর্জাতিক অপরাধের নিন্দা করা, ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সমাজকে সুরক্ষা দেওয়া, আইনের শাসনের প্রতি আস্থা পুনর্নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের মর্যাদা ও তাঁদের ওপর সংঘটিত দুর্ভোগের স্বীকৃতি দেওয়াও এর উদ্দেশ্য।

জাসদ সভাপতি ও ১৪-দলীয় জোটের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে হাসানুল হক ইনু প্রভাবশালী রাজনৈতিক অবস্থানে ছিলেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ইনুর রাজনৈতিক প্রভাব একজন সাধারণ দলীয় সদস্যের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তিনি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নিতেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন, আন্দোলন দমনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করা হতো এমন বৈঠকে অংশগ্রহণ করতেন এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের জঙ্গি, সন্ত্রাসী, ষড়যন্ত্রকারী ও রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিত্রিত করে রাজনৈতিক বয়ান তৈরিতে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখতেন।

আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে নেওয়া জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপগুলোকে হাসানুল হক ইনু বারবার সমর্থন করেছেন উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, তিনি আন্দোলনের সংগঠকদের শনাক্ত করা, অংশগ্রহণকারীদের তালিকা প্রস্তুত করা, বিক্ষোভ আয়োজনের আগেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা এবং আন্দোলনের নেতৃত্বকে ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছিলেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে নিয়ে যাওয়া বেআইনি দমন-পীড়নমূলক অভিযানে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তি ও উৎসাহ জুগিয়েছে।

হাসানুল হক ইনু জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশগ্রহণ করেছেন উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, এই অংশগ্রহণ আসামি নিশ্চিত করেছেন অপরাধে উৎসাহ দেওয়া, সহায়তা করা এবং বেসামরিক জনগণের ওপর বেআইনি দমন–পীড়নকে বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে।

গোপনে ধারণ করা টেলিফোন কথোপকথন, তাঁর টেলিভিশন সাক্ষাৎকার এবং সমসাময়িক দলিলপত্র থেকে প্রতীয়মান হয় যে আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে নেওয়া জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপগুলোকে ইনু বারবার সমর্থন করেছেন।

রায়ে বলা হয়েছে, ইনুর অংশগ্রহণের মাত্রা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। তিনি গণ–অভ্যুত্থানের সময় সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ করেননি। তবে ইনু সচেতনভাবে সহিংস দমন–পীড়নমূলক অভিযানে রাজনৈতিক বৈধতা ও নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনাল প্রশমনকারী পরিস্থিতিগুলোও বিবেচনায় নিয়েছে উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, ইনু নিজে এ মামলার ভুক্তভোগী কাউকে হত্যা করেছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যেসব অভিযোগে প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে ইনুর ফৌজদারি দায় প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তা থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে। তাঁর অধিক বয়স, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাঁর দায় প্রধানত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ইচ্ছাকৃত অবদানের কারণে সৃষ্টি হয়েছে, প্রতিটি সংঘটিত অপরাধের সরাসরি শারীরিক অপরাধী হিসেবে নয়। সাজা অবশ্যই অপরাধের মাত্রা ও ব্যক্তিগত অপরাধের দায়—উভয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে রায়ে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে রোববার এক ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, তাঁরা দু-তিন দিন আগে এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পেয়েছেন।

তাঁরা যথাসময়ে আপিল করবেন। আপিল করার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল রায়ে ইনুর উপস্থিতিতে কোনো ফৌজদারি অপরাধ (ক্রিমিনাল অফেন্স) ঘটেনি বলে একটা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এটা প্রসিকিউশনের দৃষ্টিতে যথার্থ ও আইনসংগত হয়নি। প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালের ওই আদেশে সংক্ষুব্ধ হয়েছে। তাঁরা এর বিরুদ্ধে এক মাসের মধ্যে আপিল করবেন।

Lading . . .